একজন নারীর জীবনে সবথেকে সুন্দর ও স্মরণীয় দিনগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এই
গর্ভাবস্থা বা প্রেগন্যান্সি। এই সময়ে একটি নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনার
প্রস্তুতি চলে। তবে এই সুন্দর মুহূর্তেও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়
গর্ভবতী মেয়েদের।এসব সমস্যার মধ্যে কোমর ব্যথা অন্যতম।
গর্ভাবস্থায় হঠাৎ করে শরীরের ওজন অনেক বেড়ে যাওয়ায় কম-বেশি সবার কোমরে
অস্বাভাবিক ব্যথা শুরু হয়। তবে কিছু সহজ ও নিরাপদ ঘরোয়া উপায় মেনে চললে এই
সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।চলুন জেনে নেওয়া যাক গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা কমানোর
সহজ ও কার্যকরী ঘরোয়া উপায়গুলো
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা অনেক নারীর জন্যই পরিচিত একটি সমস্যা। গর্ভের সন্তান
ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ওজন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে, ফলে কোমর
ও মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। এছাড়া হরমোনের পরিবর্তন, দীর্ঘসময়
একই ভঙ্গিতে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবেও কোমরের
অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই এই সময়ে ব্যথা কমানোর পাশাপাশি শরীরকে আরাম দেওয়া ও
দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কোমর ব্যথার অস্বস্তি কমাতে ঘরেই কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে। বসা ও
শোয়ার সময় শরীরের সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া, হালকা
হাঁটাচলা করা এবং ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে। কোমরের পেশিতে
আরাম দিতে হালকা গরম পানির সেঁক নেওয়া যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত গরম তাপ ব্যবহার
করা উচিত নয়। ঘুমানোর সময় কাত হয়ে শুয়ে হাঁটুর মাঝে একটি বালিশ রাখলেও কোমরের
ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গর্ভাবস্থায় নিজের ও অনাগত শিশুর নিরাপত্তাকে
অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনো ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করা। সাধারণ কোমর ব্যথা হলে এসব
অভ্যাস অনেকটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে ব্যথা যদি তীব্র হয়, হঠাৎ বেড়ে যায় বা এর
সঙ্গে রক্তপাত, জ্বর, পেটের তীব্র ব্যথা কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ
দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিয়মিত বিশ্রাম, সঠিক
শারীরিক ভঙ্গি ও সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথার অস্বস্তি
অনেকটাই কমিয়ে রাখা সম্ভব।
গর্ভাবস্থায় ডান কাত হয়ে ঘুমালে কি সমস্যা হয়
গর্ভাবস্থায় ঘুমানোর ভঙ্গি নিয়ে অনেকের মনেই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন থাকে। বিশেষ
করে ডান কাত হয়ে ঘুমালে মা বা গর্ভের শিশুর কোনো ক্ষতি হবে কি না, তা নিয়ে
দুশ্চিন্তা দেখা দিতে পারে।সাধারণভাবে গর্ভাবস্থায় ডান কাত হয়ে ঘুমানোকে
ক্ষতিকর বলা হয় না। তবে গর্ভাবস্থা যত এগিয়ে যায়, তত বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ
ঘুমের ভঙ্গি বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডান কাত হয়ে শোয়া অবস্থায় অস্বস্তি না হলে কিছুক্ষণ এভাবে ঘুমানো সাধারণত
সমস্যা তৈরি করে না। তবে দীর্ঘসময় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে বড় হয়ে ওঠা জরায়ুর চাপের
কারণে অস্বস্তি বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা হতে পারে।গর্ভাবস্থার পরের দিকে কাত
হয়ে ঘুমানোকে সাধারণত বেশি আরামদায়ক মনে করা হয়, আর বাম কাত অনেক ক্ষেত্রে
বিশেষভাবে আরামদায়ক হতে পারে। শরীরের স্বাভাবিক আরাম অনুযায়ী ডান ও বাম কাত
পরিবর্তন করেও ঘুমানো যায়।
আরও আরামদায়কভাবে ঘুমাতে হাঁটুর মাঝে একটি বালিশ এবং প্রয়োজন হলে পেটের নিচে বা
পিঠের পাশে বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং
কোমরের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।তবে ঘুমের ভঙ্গি নিয়ে অতিরিক্ত
দুশ্চিন্তা না করে আরাম ও পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ঘুমের সময়
কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ থাকতে অস্বস্তি হলে স্বাভাবিকভাবেই পাশ
পরিবর্তন করা যেতে পারে।
প্রেগন্যান্সিতে পিঠ ব্যথা কমানোর হালকা ব্যায়াম
গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন আসার কারণে পিঠে ব্যথা বা
অস্বস্তি হওয়া বেশ স্বাভাবিক। বিশেষ করে গর্ভের সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
পিঠ ও কোমরের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এ সময় নিয়মিত হালকা নড়াচড়া ও নিরাপদ ব্যায়াম
শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং পেশির অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে
গর্ভাবস্থায় সব ধরনের ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়, তাই নিজের শারীরিক অবস্থার
কথা বিবেচনা করে হালকা ব্যায়াম বেছে নেওয়া জরুরি।নিচে পিঠ ব্যথা কমানোর জন্য
কিছু কার্যকরী ব্যায়াম তুলে ধরা হলো।
-
হালকা হাঁটাচলাঃ প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে হাঁটলে
শরীর সক্রিয় থাকে এবং পিঠ ও কোমরের পেশিতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে
সাহায্য করে। একটানা বেশি সময় হাঁটার পরিবর্তে অল্প অল্প করে হাঁটা যেতে
পারে এবং ক্লান্তি বা অস্বস্তি অনুভূত হলে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।
-
পেলভিক টিল্ট ব্যায়ামঃ এই ব্যায়ামটি পেট ও কোমরের পেশিকে হালকাভাবে
সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁটু সামান্য
বাঁকিয়ে পেটের পেশি হালকা টান দিয়ে কোমরকে দেয়ালের দিকে আলতোভাবে চেপে ধরে
কয়েক সেকেন্ড পর ছেড়ে দিতে পারেন। ব্যথা বা অস্বস্তি হলে ব্যায়ামটি বন্ধ
করতে হবে।
-
গর্ভাবস্থার উপযোগী হালকা স্ট্রেচিংঃ ধীরে ধীরে হাত, কাঁধ, কোমর ও
পিঠের হালকা স্ট্রেচিং করলে পেশির শক্তভাব ও অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।
স্ট্রেচ করার সময় শরীরকে বেশি টান দেওয়া বা হঠাৎ ঝুঁকে পড়া উচিত নয়;
স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে নড়াচড়া করাই নিরাপদ।
-
ক্যাট-কাউ স্ট্রেচঃ হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে পিঠ সামান্য
ওপরে গোল করে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। এই হালকা নড়াচড়া
পিঠের পেশিতে টান কমাতে এবং মেরুদণ্ডের আশপাশের অংশকে কিছুটা আরাম দিতে
সাহায্য করতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় এটি করার আগে চিকিৎসক বা
ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
গর্ভাবস্থায় পিঠের ব্যথা কমানোর জন্য হালকা ব্যায়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত
বিশ্রাম, সঠিকভাবে বসা ও শোয়া এবং দীর্ঘসময় একই অবস্থানে না থাকার অভ্যাসও
গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম করার সময় তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত বা
অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই নিরাপদ ব্যায়াম
নিয়মিত করলে পিঠের অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে রাখা সম্ভব।
গর্ভাবস্থায় ভারী কাজ করার সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন আসায় দৈনন্দিন কাজকর্ম করার সময় বাড়তি
সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভারী জিনিস তোলা, বেশি সময় ঝুঁকে কাজ করা বা
অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে কোমর ও পিঠের ওপর চাপ বাড়তে পারে। এতে ব্যথা, ক্লান্তি ও
শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই এই সময়ে কাজের ধরন ও নিজের শারীরিক
সক্ষমতার দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি।
ভারী জিনিসপত্র তোলা বা বহন করা, পানিভর্তি ভারী বালতি সরানো এবং দীর্ঘসময়
দাঁড়িয়ে থেকে কঠিন কাজ করা এড়িয়ে চলা ভালো। মেঝে থেকে কোনো কিছু তুলতে হলে কোমর
বাঁকানোর পরিবর্তে হাঁটু ভাঁজ করে ধীরে ওঠা উচিত। একইভাবে দীর্ঘসময় ঝুঁকে থাকা,
সিঁড়িতে বারবার ওঠানামা করা বা শরীরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন কাজ না করাই নিরাপদ।
কাজের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি নিয়ে শরীরকে বিশ্রাম দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভাবস্থায় কতটা কাজ করা নিরাপদ, তা সবার জন্য এক রকম নয় এবং গর্ভাবস্থার সময়
ও শারীরিক অবস্থার ওপর তা নির্ভর করতে পারে। কাজ করার সময় তীব্র কোমর বা পেট
ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা
দিলে কাজ বন্ধ করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজের ও অনাগত শিশুর
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভারী কাজ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবারের
সদস্যদের সাহায্য নেওয়াই ভালো।
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথায় হট বা কোল্ড কমপ্রেস (সেঁক) দেওয়ার নিয়ম
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে অনেক সময় হালকা গরম বা ঠান্ডা
সেঁক সাময়িকভাবে আরাম দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘসময় বসে থাকা, দাঁড়িয়ে থাকা বা
শরীরে অতিরিক্ত চাপ পড়ার পর পেশিতে অস্বস্তি হলে সেঁক উপকারী হতে পারে। তবে
গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার করা ঠিক নয় এবং সেঁক দেওয়ার সময় ত্বকের
নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। সঠিক নিয়ম মেনে অল্প সময়ের জন্য সেঁক দিলে
অস্বস্তি কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে। নিচে হট বা কোল্ড কমপ্রেস (সেঁক) দেওয়ার
নিয়মগুলো তুলে ধরা হলো ।
হট কমপ্রেস বা গরম সেঁক দেওয়ার নিয়ম
-
হালকা গরম পানি ব্যবহার করুনঃ পরিষ্কার কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে
ভালোভাবে নিংড়ে কোমর বা পিঠের ব্যথার জায়গায় আলতো করে রাখতে পারেন। পানি
যেন খুব গরম না হয়, তা আগে হাতে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।
-
অল্প সময় সেঁক দিনঃ একবারে প্রায় ১০–১৫ মিনিটের মতো সেঁক দেওয়া যেতে
পারে। দীর্ঘসময় ধরে গরম সেঁক না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি দিয়ে ব্যবহার
করা ভালো।
-
ত্বক সরাসরি অতিরিক্ত তাপে রাখবেন নাঃ হট ওয়াটার ব্যাগ বা হিটিং প্যাড
ব্যবহার করলে তা সরাসরি ত্বকের ওপর না রেখে পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ব্যবহার
করা উচিত। পেটের ওপর সরাসরি গরম সেঁক দেওয়া এড়িয়ে চলুন।
কোল্ড কমপ্রেস বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়ার নিয়ম
-
বরফ সরাসরি ত্বকে দেবেন নাঃ বরফ বা আইস প্যাক পাতলা কাপড়ে মুড়িয়ে
ব্যথার জায়গায় ব্যবহার করুন। এতে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে ত্বকের ক্ষতি
হওয়ার ঝুঁকি কমে।
-
অল্প সময় ব্যবহার করুনঃ ঠান্ডা সেঁক সাধারণত ১০–১৫ মিনিটের মতো
ব্যবহার করা যেতে পারে। ত্বক অতিরিক্ত ঠান্ডা, অসাড় বা অস্বস্তিকর মনে হলে
সঙ্গে সঙ্গে সেঁক সরিয়ে ফেলতে হবে।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী পদ্ধতি বেছে নিনঃ পেশির টান বা শক্তভাবের ক্ষেত্রে হালকা
গরম সেঁক আরামদায়ক হতে পারে, আবার নতুন করে হওয়া অস্বস্তি বা সামান্য
ফোলাভাব থাকলে ঠান্ডা সেঁক কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কোনটি আপনার জন্য
উপযুক্ত তা নিয়ে দ্বিধা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরের ব্যথা কমাতে হট বা কোল্ড কমপ্রেস ব্যবহার করা যেতে
পারে, তবে নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় আগে বিবেচনা করা উচিত। অতিরিক্ত গরম বা
ঠান্ডা সেঁক, দীর্ঘসময় ব্যবহার এবং পেটের ওপর সরাসরি তাপ প্রয়োগ এড়িয়ে চলা
জরুরি। ব্যথা তীব্র হলে, বারবার হলে বা রক্তপাত, পেটের ব্যথা, জ্বর কিংবা অন্য
কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে ঘরোয়া সেঁকের ওপর নির্ভর না করে
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও দাঁড়ানোর সঠিক নিয়ম
গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন আসার কারণে দীর্ঘসময় ভুল ভঙ্গিতে
বসা বা দাঁড়িয়ে থাকলে পিঠ ও কোমরে ব্যথা বাড়তে পারে। তাই দৈনন্দিন কাজের সময়
শরীরের ভঙ্গির দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি। সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও দাঁড়ানোর
অভ্যাস কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বসার সময় পিঠ সোজা রেখে চেয়ারের পেছনে ভালোভাবে ঠেস দিয়ে বসা এবং প্রয়োজনে
কোমরের পেছনে ছোট বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে। দুই পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন
এবং দীর্ঘসময় একই অবস্থানে না থেকে কিছুক্ষণ পরপর অবস্থান পরিবর্তন করুন।
দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ে সমানভাবে শরীরের ওজন রাখুন এবং দীর্ঘসময় একটানা দাঁড়িয়ে
থাকা এড়িয়ে চলুন।
কোনো কিছু তুলতে হলে কোমর থেকে ঝুঁকে না গিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে ধীরে নিচে নামা
এবং জিনিসটি শরীরের কাছাকাছি রেখে ওঠা নিরাপদ। হাঁটার সময় কাঁধ স্বাভাবিক রেখে
মাথা ও পিঠ যতটা সম্ভব সোজা রাখার চেষ্টা করুন। এসব অভ্যাস নিয়মিত মেনে চললে
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমিয়ে আরামদায়কভাবে দৈনন্দিন কাজ
করা সহজ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পায়ের রগে টান পড়ার কারণ
গর্ভাবস্থায় পায়ের রগে টান বা পেশিতে হঠাৎ খিঁচুনি হওয়া বেশ সাধারণ একটি
সমস্যা। বিশেষ করে রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বা ঘুমের মধ্যে পায়ের পেশিতে
আকস্মিক টান অনুভূত হতে পারে। শরীরের ওজন বৃদ্ধি ও গর্ভাবস্থাজনিত বিভিন্ন
পরিবর্তনের কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পায়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া, দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকা বা বেশি
হাঁটাহাঁটি করলে পেশিতে টান ধরতে পারে। এছাড়া শরীরে পানি কমে যাওয়া এবং
পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেশিয়ামের মতো কিছু খনিজের ভারসাম্যে পরিবর্তনও
এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। রক্ত চলাচলের পরিবর্তন ও পেশিতে অতিরিক্ত চাপও
অনেক সময় এই অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।
পায়ের রগে টান পড়া সাধারণত সাময়িক হলেও বারবার হলে বা খুব বেশি ব্যথা হলে
বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা হাঁটাচলা ও নিয়মিত
স্ট্রেচিং পেশিকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে পা ফুলে যাওয়া, লাল বা
গরম হয়ে যাওয়া কিংবা এক পায়ে তীব্র ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
জরুরি।
প্রথম তিন মাসে গর্ভবতী মায়ের বিশেষ যত্ন
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় হিসেবে ধরা হয়, কারণ এ
সময় ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ শুরু হয় এবং মায়ের শরীরেও নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা
দিতে পারে। বমিভাব, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, খাবারে অনীহা বা গন্ধে অস্বস্তির মতো
সমস্যা অনেকেরই হতে পারে। তাই এই সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার,
প্রয়োজনীয় ওষুধ-সাপ্লিমেন্ট এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা
গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ধূমপান, অ্যালকোহল ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ
গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। নিচে গর্ভবতী মায়েদের প্রথম ৩ মাসের প্রয়োজনীয় যত্ন
তুলে ধরা হলো ।
-
প্রথম মাসে যত্নঃ গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে জানা ভালো।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ
গর্ভাবস্থার শুরুতেই এটি শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বিকাশে
সহায়তা করে। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম
নেওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ভারী কাজ এড়িয়ে চলার অভ্যাস শুরু করা উচিত।
-
দ্বিতীয় মাসে যত্নঃ এই সময়ে বমিভাব, দুর্বলতা ও ক্লান্তি আরও বেশি
অনুভূত হতে পারে, তাই একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার
খাওয়া যেতে পারে। শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ বা মাংসসহ পুষ্টিকর ও নিরাপদ
খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। কাঁচা বা অপরিষ্কার খাবার এড়িয়ে চলা,
পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট নিয়ম
মেনে গ্রহণ করা উচিত।
-
তৃতীয় মাসে যত্নঃ তৃতীয় মাসেও নিয়মিত প্রসবপূর্ব চেকআপ চালিয়ে যাওয়া
এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। শরীর
ভালো থাকলে চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে হালকা হাঁটাচলা করা যেতে পারে, তবে
অতিরিক্ত পরিশ্রম বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন কাজ এড়িয়ে চলা উচিত।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পাশাপাশি মানসিক চাপ কমিয়ে শান্ত ও স্বস্তিদায়ক
পরিবেশে থাকার চেষ্টা করাও মায়ের জন্য উপকারী।
প্রথম তিন মাসে মায়ের শরীর ও অনাগত শিশুর বিকাশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া
প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট এবং নিয়মিত
চিকিৎসকের পরামর্শ এই বিষয়গুলো এ সময়ের যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতিরিক্ত
রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি, প্রচণ্ড বমি বা অন্য কোনো
অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জনপ্রিয় প্রশ্ন ও উত্তর
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথার কারণ কী?
গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমর ব্যথা প্রধানত হরমোনের পরিবর্তন, শরীরের ওজন
বৃদ্ধি এবং শারীরিক ভঙ্গির পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে।
সিজারের পর কোমর ব্যথা কতদিন থাকে?
সিজারের পর কোমর ব্যথা সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বা সর্বোচ্চ কয়েক মাস
পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি দিনও থাকতে
পারে।
কোমর ব্যথার জন্য কোন ওষুধ ভালো?
কোমর ব্যথার জন্য সাধারণত পেইন কিলার বা নন-স্টেরয়েডাল
অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন আইবুপ্রোফেন বা নেপ্রোক্সেন
ব্যবহৃত হয়।
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কোমর ব্যথা হলে কী করণীয়?
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কোমর ব্যথা কমানোর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং
পিঠে হালকা গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিন।
সিজার করলে কি কি সমস্যা হয়?
সিজারিয়ান অপারেশনের (সিজার) মাধ্যমে সন্তান প্রসব করলে মায়ের শরীরে
বিভিন্ন ধরনের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা বা ঝুঁকি তৈরি হতে
পারে।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
গর্ভাবস্থায় কোমর, পিঠ বা পায়ের পেশিতে ব্যথা ও টান পড়া অনেক মায়ের জন্যই
অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে কিছুটা সচেতনতা, সঠিকভাবে বসা ও শোয়া,
পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সতর্কতা অবলম্বন করলে এই অস্বস্তি
অনেকটাই কমিয়ে রাখা সম্ভব। শরীরের পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নিজের
প্রতি একটু বেশি যত্নশীল হওয়াই এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হালকা হাঁটাচলা, নিরাপদ ব্যায়াম, প্রয়োজন অনুযায়ী গরম বা ঠান্ডা সেঁক এবং সঠিক
ভঙ্গিতে চলাফেরার মতো অভ্যাসগুলো আরাম দিতে পারে। পাশাপাশি ভারী কাজ, অতিরিক্ত
পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসা গ্রহণ করা থেকে
বিরত থাকা উচিত। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে খাবার, বিশ্রাম,
প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া
প্রয়োজন।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, প্রতিটি মায়ের গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। তাই
কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা,
মাথা ঘোরা বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না
করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি অনাগত
শিশুর নিরাপত্তার কথাও মাথায় রেখে সচেতন থাকলেই এই সময়টাকে আরও স্বস্তিদায়ক ও
সুন্দর করে তোলা সম্ভব।
SAROWAR365- এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url